হারিয়ে যাচ্ছে শেরপুরের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা-সংস্কৃতি

হারিয়ে যাচ্ছে শেরপুরের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা-সংস্কৃতি

রাকিবুল আওয়াল পাপুল, শেরপুর

হারিয়ে যাচ্ছে শেরপুর সীমান্ত অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি। পরিবারে চর্চা কমে যাওয়া এবং নিজস্ব ভাষায় লেখাপড়ার সুযোগ না থাকায় এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষেরা। ভাষা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষায় সংস্কৃতি কেন্দ্র, পাঠ্যবই এবং শিক্ষক দরকার বলে দাবি তাদের।

তাই প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বইয়ের পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষায় দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও সংস্কৃতি কেন্দ্র স্থাপনের দাবি তুলছেন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নেতারা।

২০১৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে দেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের পাঁচটি মাতৃভাষায় পাঠ্যবই বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়। তবে মাঠপর্যায়ে এর সুফল মিলছে সীমিত আকারে। স্থানীয় শিক্ষকদের অভিযোগ, চলতি বছর অনেক বিদ্যালয়ে সময়মতো মাতৃভাষার বই পৌঁছায়নি।

বারোমারি সেন্ট লিও স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা অগ্নেশ সরেন বলেন, একটি জাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রধান ভিত্তি তার নিজস্ব ভাষা। পাহাড়ের পাদদেশে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অধিকাংশ শিক্ষার্থী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর। আগে গারো ভাষার পাঠ্যপুস্তক পেলেও এ বছর কোনো বই পাইনি। অন্যান্য বইয়ের মতো বছরের শুরু থেকেই নিজস্ব ভাষার মাতৃভাষার বই হাতে পেলে শিশুদের শেখানো সহজ হয়।

মাতৃভাষা ভিত্তিক বহুভাষিক শিক্ষা (এমএলই) কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত একটি স্কুলের সহকারী শিক্ষক পরিমল কোচ বলেন, আমাদের কোচ সম্প্রদায়সহ জাতিগোষ্ঠীগুলোর নিজস্ব ভাষা রয়েছে। নিয়মিত পড়াশোনা ও চর্চা না থাকলে কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই এই ভাষা হারিয়ে যাবে। সরকারের কাছে অনুরোধ, ভাষাগুলো টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কারিতাস জেলার তিনটি উপজেলায় প্রায় এক দশক ধরে মাতৃভাষাভিত্তিক প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ‘মাতৃভাষা ভিত্তিক বহুভাষিক শিক্ষা’ (এমএলই) কর্মসূচির আওতায় জেলাজুড়ে প্রায় ৪০টি স্কুলে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা চর্চা করা হচ্ছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

কারিতাসের নালিতাবাড়ী উপজেলা সমন্বয়কারী হিলারিয়ুস রিছিল বলেন, গারো, হাজং ও কোচ সম্প্রদায়ের শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার আগে মাতৃভাষা শেখার সুযোগ দিতে আমরা কাজ করছি। তবে বৃহৎ পরিসরে সরকারি সহায়তা ছাড়া ভাষা সংরক্ষণ সম্ভব নয়।

উল্লেখ্য, শেরপুরের সীমান্তবর্তী শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ি উপজেলায় সাতটি নৃগোষ্ঠীর প্রায় ৫৪ হাজার মানুষের বসবাস। এর মধ্যে গারো, কোচ, বর্মণ ও হদিদের সংখ্যাই বেশি।

আইইডির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এ জেলায় গারো সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা ১৬ হাজার পাঁচশ’ জন, হাজং জনসংখ্যা চার হাজার সাতশ’ জন, হদি ১০ হাজার ছয়শ’ জন, বর্মণ ১৭ হাজার জন, কোচ তিন হাজার পাঁচশ’ জন, ডালু এগারশ’ জন এবং বানাই একশ’ ১০ জন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *