
বিগত নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোটে কারাগারে থাকা ব্যক্তিরাও নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। তবে দেশের ৬৮টি কারাগারে প্রায় ৮২ হাজার বন্দির মধ্যে ভোটের জন্য অনলাইনে নিবন্ধন করেছেন মাত্র ২ হাজার ৬৯৬ জন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ১৩৯। সেই হিসেবে এবার ভোট দিতে আগ্রহী কারাবন্দির সংখ্যা বেড়েছে। তবে মোট কারাবন্দির তুলনায় এই সংখ্যা এখনও বেশ কম।
কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ ডিসেম্বর বিকাল পর্যন্ত মোট বন্দিদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৯০০ জন। তবে দেশে কারাগার ৬৮টি হলেও বন্দিরা নিবন্ধন করেছেন ৪০টি কারাগার থেকে। অবশ্য কারাবন্দিদের ভোটের জন্য নিবন্ধনের আগ্রহ কম থাকার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে বলে জানা গেছে।
পোস্টাল অ্যাপে যেভাবে ভোট দেবেন বন্দিরা
কারা অধিদফতর জানিয়েছে, বন্দিদের জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য কারাগারে সংরক্ষিত রয়েছে। ভোট দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশন (ইসি) একটি পোস্টাল অ্যাপ তৈরি করেছে। ওই অ্যাপের মাধ্যমেই বন্দিদের নিবন্ধন সম্পন্ন করা হয়েছে।
ভোটের দিন সংশ্লিষ্ট এলাকার নিবন্ধিত ভোটারদের জন্য নির্বাচন কমিশন পৃথকভাবে খাম পাঠাবে। এতে থাকবে তিনটি খাম, ভোট প্রদানের নিয়মাবলি, স্বাক্ষরের জন্য নির্ধারিত স্থান এবং ব্যালট পেপার। বন্দিরা ব্যালট পেপারে ভোট দিয়ে খাম সিল করবেন। পরে ব্যালট পেপারের খাম ও স্বাক্ষরসংবলিত কপিটি আরেকটি খামে ভরে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেবেন। কারা কর্তৃপক্ষ সেগুলো পোস্ট অফিসে পাঠাবেন। ডাক বিভাগ এক্সপ্রেস ব্যবস্থায় খামগুলো নির্বাচন কমিশনে পাঠাবে। এরপর নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকায় জমা পড়া ভোটের সংখ্যা যুক্ত করবে।
এছাড়া ভোটের দিন দায়িত্ব পালনকারী কারা কর্মকর্তারাও পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে পারবেন।
কারা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
কারা অধিদফতরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) জান্নাত-উল-ফরহাদ বলেন, “বন্দিদের এনআইডি তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তৈরি পোস্টাল অ্যাপের মাধ্যমে বন্দিদের ভোটার আইডির তথ্য নিয়ে নিবন্ধন করা হয়েছে। ৪০টি কারাগারে ২ হাজার ৬৯৬ জন বন্দি ভোটের জন্য অনলাইনে নিবন্ধন করেছেন। ২০২৫ সালের ২০ ডিসেম্বর থেকে অনলাইন নিবন্ধন শুরু হয় এবং শেষ হয় ৩১ ডিসেম্বর। কারাগারেই ভোটের বুথ স্থাপন করা হবে।”
তিনি বলেন, “যেসব কারাগারে বন্দিরা ভোট দেবেন, সেখানে প্রয়োজনীয় কম্পিউটার ও প্রিন্টার আছে কি না— তা নির্বাচন অফিস আগে থেকেই যাচাই করেছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সরঞ্জামও সরবরাহ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী ভোটের প্রতীক প্রিন্ট করে বন্দিদের দেখানো হবে, যাতে তারা প্রতীক চিনে ভোট দিতে পারেন।”
কারাবন্দিদের নিবন্ধন সংখ্যা কম যেসব কারণে
৮২ হাজার বন্দির মধ্যে মাত্র ২ হাজার ৬৯৬ জন কেন ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন— জানতে চাইলে জান্নাত-উল-ফরহাদ বলেন, “বেশিরভাগ বন্দির ভোটার আইডি নেই। এছাড়া কারাগারে পোস্টাল অ্যাপে একবার নিবন্ধন হয়ে গেলে ভোটের আগে জামিনে মুক্তি পেলে ওই ব্যক্তি এবছর বাইরে ভোট দিতে পারবেন না। নিজ এলাকার ভোটার তালিকাতেও এবছর তার নাম থাকবে না। ভোটের আগে মুক্তির আশায় অনেক বন্দিই ভোট দিতে আগ্রহ দেখাননি।”
কারাবন্দিদের ভোটের বিষয়ে ইসির নির্দেশনা
নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা ২০০৮ (সংশোধন ২০২৫)-এর বিধি ১০ক অনুযায়ী, ‘ইন-কান্ট্রি পোস্টাল ভোটিং’ (আইসিপিভি) পদ্ধতির মাধ্যমে এই প্রথমবার জেলখানায় থাকা ব্যক্তিরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। ইসির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রতিটি জেলখানার বন্দিদের ভোটার নিবন্ধনের জন্য একটি বিশেষ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম উন্মুক্ত থাকবে। প্রতিটি কারাগার থেকে কারা কর্তৃপক্ষ দুইজন প্রতিনিধি মনোনয়ন দেবেন, যারা বন্দিদের নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। নিবন্ধিত ভোটারদের তালিকা সিল ও স্বাক্ষরসহ নির্বাচন কমিশনে পাঠাতে হবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত পোর্টালে ভোটারদের প্রয়োজনীয় তথ্য (.xls/.csv ফরম্যাটে) আপলোড করতে হবে।
নিবন্ধিত ভোটাররা কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ‘বহির্গামী খাম’ (ফরম–৯ক) পাবেন। এতে থাকবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য দুটি আলাদা ব্যালট পেপার, ভোট প্রদানের নির্দেশাবলি ও ঘোষণাপত্র (ফরম–৮) এবং রিটার্নিং অফিসারের ঠিকানা সংবলিত ফেরত খাম (ফরম–১০খ)।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, জেলখানার ভেতরে ভোট প্রদানের জন্য গোপন কক্ষ বা উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ভোটগ্রহণ শেষে খামগুলো সুরক্ষিতভাবে সংগ্রহ করে দ্রুত ডাক বিভাগের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের কাছে পাঠানো হবে।