মহেশখালী ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (এমআইডিএ) একটি টেকসই নীল অর্থনীতির সমর্থনে মৎস্য ও সামুদ্রিক বিষয়ে সহযোগিতা বাড়াতে জাপানের প্রখ্যাত সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের (এসপিএফ) সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) বিকালে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতিতে এমআইডিএ’র নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এবং এসপিএফের ওশান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (ওপিআরআই) সভাপতি অধ্যাপক মিতসুতাকু মাকিনো সমঝোতা স্মারকে সই করেন। এদিন বিকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এই চুক্তি সই হয়।
আগামী সপ্তাহগুলোতে এসপিএফ সভাপতি ড. আতসুশি সুনামি এই চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করবেন। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ওপিআরআই’র সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. এমাদুল ইসলাম এবং এমআইডিএ’র সদস্য কমডোর তানজিম ফারুক।
চুক্তি সই অনুষ্ঠান শেষে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস সমুদ্র সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, আমাদের সমুদ্র একটি বড় সম্পদ, তবু এটি ক্রমশ দূষিত হচ্ছে। সমুদ্রের গভীরে প্লাস্টিক বর্জ্য এখন কয়েক হাজার মিটার গভীরে পাওয়া গেছে। এই সমঝোতা স্মারক আমাদের সমুদ্র রক্ষা ও পরিষ্কার রাখতে সহায়তা করবে।
অংশীদারত্বের তাৎপর্য তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, অবশ্যই আমাদের সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষা করতে হবে। সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশন তার সামুদ্রিক গবেষণার জন্য বিশ্বব্যাপী সম্মানিত। আমাদের গবেষণা উদ্যোগে তাদের সম্পৃক্ত করতে পেরে আমরা আনন্দিত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স ইনস্টিটিউট এই ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত থাকবে এবং এই গবেষণা সহযোগিতা ক্রমান্বয়ে সম্প্রসারিত হবে।
প্রধান উপদেষ্টা আরও উল্লেখ করেন, সমঝোতা স্মারকের অধীনে, সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশন উমিগিয়োর (সামুদ্রিক শিল্পভিত্তিক কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মহেশখালীর তিনটি গ্রামকে মডেল ফিশিং ভিলেজ হিসেবে গড়ে তুলতে এমআইডিএকে সহায়তা করবে।
মহেশখালী এবং এর বাইরেও উপকূলীয় উন্নয়ন ও কৌশলগত অবকাঠামোর জন্য বাংলাদেশের নিবেদিত সংস্থা হিসেবে এমআইডিএ মৎস্য ও সামুদ্রিক বিষয়ে জাতীয় অগ্রাধিকারকে এগিয়ে নিতে এসপিএফের সাথে অংশীদারত্ব করবে—যা বাংলাদেশের ২০টিরও বেশি মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং সংস্থা দ্বারা গঠিত অগ্রাধিকার।
সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশন বিশ্বের বৃহত্তম স্বাধীন জনহিতকর প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি রয়েছে সামুদ্রিক নীতি, বিপর্যয়ের ঝুঁকি হ্রাস এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন।
এই সমঝোতাপত্রের আওতায় এমআইডিএ এবং এসপিএফ মেরিকালচার, মৎস্য চাষ, ফসল কাটা পরবর্তী ব্যবস্থাপনা, সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের কল্যাণে জাপানের নীল অর্থনীতির মডেল গ্রহণের সম্ভাব্যতা বিশ্লেষণসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে।
এ সহযোগিতায় উমিগিয়ো (সামুদ্রিক শিল্পভিত্তিক কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট), সমন্বিত উপকূলীয় জীবিকা নির্বাহ, সমুদ্রে নিরাপত্তা, কমিউনিটিভিত্তিক সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, টেকসই স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং মৎস্যজীবী জনগোষ্ঠী ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে দ্বিমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
মৎস্যসম্পদ এবং উপকূলীয় পর্যটনের সম্ভাবনা নিয়েও বেসলাইন সমীক্ষা চালানো হবে। জেটি, স্বয়ংক্রিয় মৎস্য অবতরণের সুবিধা, কোল্ডচেইন এবং পরিবহন লজিস্টিকস, সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ সুবিধা এবং বাজার-শৃঙ্খল উন্নয়নের মতো পরিকাঠামো উন্নয়ন সহযোগিতার আরও একটি মূল স্তম্ভ হয়ে উঠবে।
এছাড়া গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার কার্যক্রম, সামুদ্রিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ, সামুদ্রিক চাষ, উচ্চ মূল্য সংযোজন পণ্যের জন্য প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং উপজাত পণ্য ব্যবহার, রফতানি বহুমুখীকরণ, বিনিয়োগ সুবিধা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সমুদ্রে নিরাপত্তা, মান নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যবিধি ও শ্রম মান নিয়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।
সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের ওপিআরআই’র প্রেসিডেন্ট প্রফেসর মিতসুতাকু মাকিনো বলেন, ‘এই অংশীদারত্ব একটি সমন্বিত ও টেকসই ব্লু ইকোনমি প্রচারে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে, বিশেষ করে মৎস্য খাতে কাজ করার একটি মূল্যবান সুযোগ এনে দিয়েছে।’ তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই সহযোগিতা জাপান-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আরও জোরদার করবে এবং বাংলাদেশের উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর কল্যাণ ও টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখবে।
এমআইডিএ'র নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এমআইডিএ’র দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির ওপর আলোকপাত করে বলেন, ‘নতুন অর্থনৈতিক সীমানা গড়ে তোলার পাশাপাশি উপকূলজুড়ে মৎস্যজীবী জনগোষ্ঠীর মধ্যে শতাব্দী প্রাচীন জীবনযাত্রা সংরক্ষণে এমআইডিএ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এসপিএফের সঙ্গে এই অংশীদারত্ব মূল্যবোধ ও কর্মকাণ্ডের একটি সারিবদ্ধ এবং বাংলাদেশকে জাপানের উমিগিও পদ্ধতির কাছ থেকে শিক্ষা নিতে দেয়—সামুদ্রিক ভিত্তিক উপকূলীয় সম্প্রদায় উন্নয়ন, যা জীবিকা, টেকসই এবং প্রবৃদ্ধিকে সংহত করে। এটি বঙ্গোপসাগরকে উন্মোচন করার জন্য প্রয়োজনীয় বিজ্ঞান, কৌশল এবং ব্যবস্থাপনার প্রসার ঘটাতে সাহায্য করবে। এই সীমান্তে প্রবেশ করতে বাংলাদেশকে এখন উচ্চতর পর্যায়ে কাজ করতে হবে।
১৩-১৪ জানুয়ারি ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘টেকসই নীল অর্থনীতি, সংযোগ এবং ক্ষুদ্র দ্বীপ উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর জন্য স্থিতিস্থাপকতা (এসআইডিএস)’ শীর্ষক উচ্চ-পর্যায়ের সংলাপের ফাঁকে এই সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এসপিএফ, এমআইডিএ’র ওশান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ওপিআরআই) এবং পিস অ্যান্ড পলিসি সলিউশনস (বাংলাদেশ) যৌথভাবে দুদিনব্যাপী এই সম্মেলনের আয়োজন করে। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের বলিষ্ঠ নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ এবং উন্নয়ন অংশীদাররা এই আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন।