সাভারের পরিত্যক্ত পৌর কমিউনিটি সেন্টারটি কেন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল, তার উত্তর মিলেছে। গত ছয় মাসে এই ভবন ও এর আশপাশ থেকে উদ্ধার হওয়া ছয়টি মরদেহের নেপথ্যে ছিলেন একজনই ব্যক্তি— মশিউর রহমান খান সম্রাট ওরফে ‘সাইকো সম্রাট’। রোববার দুপুরে দুটি পোড়া মরদেহ উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ এই দুর্ধর্ষ খুনিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
গ্রেপ্তারকৃত সম্রাট সাভারের ব্যাংক কলোনি এলাকার মৃত সালামের ছেলে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি একে একে ছয়টি হত্যাকাণ্ড একাই ঘটিয়েছেন বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন।
সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারে বারবার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় অতিষ্ঠ হয়ে সম্প্রতি ভবনটির চারপাশে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেছিল ঢাকা জেলা পুলিশ। গতকাল রোববার দুপুরে যখন ভবনের দ্বিতীয় তলায় অজ্ঞাত এক যুবক (২৫) এবং এক কিশোরীর (১৩) আগুনে পোড়া মরদেহ পাওয়া যায়, তখন পুলিশ দ্রুত ফুটেজ সংগ্রহ করে।
ফুটেজে দেখা যায়, মশিউর রহমান সম্রাট ওই ভবনে সন্দেহজনকভাবে যাতায়াত করছেন। এরপর পুলিশ সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তিনি খুনের কথা স্বীকার করলে তাকে গতকালের জোড়া খুনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, গত বছরের জুলাই মাস থেকে শুরু করে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সম্রাট অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটিয়েছেন। তার শিকার হওয়া ব্যক্তিদের তালিকাটি নিম্নরূপ:
৪ জুলাই ২০২৪: সাভার মডেল মসজিদের পাশের একটি চায়ের দোকানের পেছন থেকে আসমা বেগম (৭৫) নামে এক বৃদ্ধার মরদেহ উদ্ধার। এটিই ছিল সম্রাটের প্রথম শিকার।
২৯ আগস্ট ২০২৪: পৌর কমিউনিটি সেন্টারের দ্বিতীয় তলায় এক যুবকের (৩০) হাত-পা বাঁধা ও গলায় ওড়না প্যাঁচানো অর্ধগলিত মরদেহ।
১১ অক্টোবর ২০২৪: একই তলা থেকে এক অজ্ঞাত নারীর (৩০) মরদেহ উদ্ধার।
১৯ ডিসেম্বর ২০২৪: একই স্থানে এক পুরুষের (৩৫) আগুনে পোড়া অর্ধগলিত মরদেহ।
১৮ জানুয়ারি ২০২৬: সবশেষ গতকাল দুপুরে একই ভবন থেকে এক যুবক ও এক কিশোরীর পোড়া মরদেহ উদ্ধার।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, সম্রাটের হত্যার ধরণ ছিল অত্যন্ত নৃশংস। তিনি মূলত পরিত্যক্ত এই ভবনটিকে তার ‘কিলিং জোন’ হিসেবে ব্যবহার করতেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি শিকারকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করতেন এবং পরে আলামত নষ্ট করতে ও পরিচয় গোপন রাখতে মরদেহে আগুন ধরিয়ে দিতেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, অপস ও ট্রাফিক উত্তর) আরাফাতুল ইসলাম বলেন, সম্রাটকে জিজ্ঞাসাবাদের পর আমরা স্তম্ভিত। প্রতিটি খুনের পেছনে তার দেওয়া তথ্যগুলো আমরা যাচাই করছি। সে যেভাবে ঠাণ্ডা মাথায় খুনের বর্ণনা দিয়েছে, তা কেবল একজন বিকৃত মস্তিষ্কের বা সাইকোপ্যাথের পক্ষেই সম্ভব। ময়নাতদন্তের পর প্রতিটি খুনের সঠিক কারণ ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমরা আরও নিশ্চিত হতে পারব।
সাভার মডেল থানার অদূরেই একটি সরকারি ভবনে দিনের পর দিন এমন সিরিয়াল কিলিং চলতে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছিল। গতকালের গ্রেপ্তারের পর এলাকাবাসী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও প্রশ্ন উঠেছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে।
পুলিশ জানিয়েছে, সম্রাটকে আজ আদালতে পাঠিয়ে রিমান্ডের আবেদন করা হবে। তিনি কেন এই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটিয়েছেন—এটি কি কেবল বিকৃত আনন্দ লাভের জন্য নাকি এর পেছনে কোনো বড় চক্র বা উদ্দেশ্য রয়েছে, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
মশিউর রহমান সম্রাট ওরফে সাইকো সম্রাটের গ্রেপ্তার সাভারের অপরাধ জগতের এক কালো অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটিয়েছে। তবে পরিত্যক্ত ভবনগুলো যে অপরাধীদের কত বড় স্বর্গরাজ্য হতে পারে, সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টার তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। এই ভবনটি অবিলম্বে সংস্কার অথবা স্থায়ীভাবে সিলগালা করার দাবি জানিয়েছে সাভারের সাধারণ মানুষ।