ওয়ান নিউজ ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ ১১০ দিন ধরে চলা রক্তক্ষয়ী ও বিধ্বংসী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যকার ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক (MoU)। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের ঐতিহাসিক ভার্সাই প্রাসাদে এক নৈশভোজ সভায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বহুল আলোচিত শান্তি চুক্তিতে সই করেন। অন্যদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও তেহরানে বসে এই ঐতিহাসিক নথিতে তাঁর চূড়ান্ত স্বাক্ষর সম্পন্ন করেছেন।
ভার্সাই প্রাসাদ থেকে বের হওয়ার সময় সেখানে উপস্থিত বিশ্ব গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি নিজে সরাসরি নিশ্চিত করেন। ট্রাম্প বলেন, ‘এটি চূড়ান্তভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে। আমি এই মাত্র প্যারিসের ভার্সাই প্রাসাদে বসে চুক্তিটিতে সই করলাম।’ হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর উপস্থিতিতে ট্রাম্পকে ফার্সি ও ইংরেজি ভাষায় প্রস্তুতকৃত এই চুক্তির কপিতে সই করতে দেখা যায়।
এদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদসংস্থা ‘ইরনা’ (IRNA) তাদের বিশেষ প্রতিবেদনে দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের স্বাক্ষরিত ১৪ দফার এই অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তির বেশ কয়েকটি বিশেষ আলোকচিত্র প্রকাশ করেছে। প্রকাশিত ছবিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে অত্যন্ত প্রফুল্ল চিত্তে চুক্তির মূল নথিতে স্বাক্ষর করতে এবং পরবর্তীতে নিজের ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর সংবলিত চুক্তির পাতাগুলো উঁচিয়ে প্রদর্শন করতে দেখা গেছে। ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই নিশ্চিত করেছেন যে, ফার্সি ১৪০৫ সালের ১৮ জুন (বৃহস্পতিবার) প্রথম প্রহরে এই ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’টি উভয় পক্ষের সম্মতিতে চূড়ান্ত কার্যকর করা হয়েছে।
১৪ দফার এই শান্তি চুক্তির মূল শর্তাবলি:
১. যুদ্ধাবস্থার অবসান: লেবাননসহ সকল ফ্রন্টে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও তাদের মিত্রদের মধ্যকার যাবতীয় সামরিক অভিযান অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হলো।
২. নৌ অবরোধ প্রত্যাহার ও হরমুজ প্রণালি উন্মুক্তকরণ: চুক্তি স্বাক্ষরের সাথে সাথেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে তাদের দীর্ঘদিনের নৌ অবরোধ সম্পূর্ণ তুলে নিচ্ছে। এর বিপরীতে ইরান আগামী ৩০ দিনের মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ও নিরাপদ করে দেবে।
৩. তেল রপ্তানি ও নিষেধাজ্ঞা শিথিল: চুক্তি কার্যকর হওয়ার সাথে সাথেই মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ইরানের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য রপ্তানির ওপর থেকে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে বিশেষ ‘ওয়েভার’ বা ছাড়পত্র জারি করবে।
৪. পরমাণু কর্মসূচির নজরদারি: ইরান কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বলে চুক্তিতে অঙ্গীকার করেছে। দেশটির মজুতকৃত উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ইরানি ভূখণ্ডেই ডিলিউট বা নিষ্ক্রিয় করা হবে।
৫. পুনর্গঠন তহবিল: আগামী ৬০ দিনের মধ্যে দুই দেশ একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে কাজ করবে। সেই চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক অংশীদারদের সাথে নিয়ে ইরানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বিশাল বৈশ্বিক তহবিল গঠন করবে যুক্তরাষ্ট্র।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং কাতারের মধ্যস্থতায় সম্পন্ন হওয়া এই ঐতিহাসিক চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে বিশ্ব সম্প্রদায়। আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় টেকনিক্যাল বা কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা শুরু করতে দুই দেশের প্রতিনিধি দল ইতিমধ্যে সেখানে পৌঁছাতে শুরু করেছে। তবে এই চুক্তি নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় পক্ষের কিছু নেতা তীব্র সমালোচনা করেছেন এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই চুক্তি মানতে অস্বীকৃতি জানিয়ে লেবানন ও গাজায় তাঁর দেশের সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও, ট্রাম্প-পেজেশকিয়ানের এই সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে এক নজিরবিহীন যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

