আইনি ইতিহাসে নতুন নজির: ২৯ কার্যদিবসে শিশু ধর্ষণ মামলায় ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড

আইনি ইতিহাসে নতুন নজির: ২৯ কার্যদিবসে শিশু ধর্ষণ মামলায় ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক:

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় ১০ বছর বয়সী এক কন্যাশিশুকে ধর্ষণের অপরাধে শাকিল হোসেন নামের এক যুবকের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। রবিবার (২৪ মে) দুপুরে মেহেরপুর জেলা জজ আদালতের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিজ্ঞ বিচারক তাজুল ইসলাম এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।

পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদন (চার্জশিট) পাওয়ার পর মাত্র ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে এই রায় ঘোষণা করা হলো, যা দেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে প্রথম ও একটি অনন্য মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শাকিল হোসেন মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার চাঁদপুর গ্রামের আব্দাল হাসানের ছেলে ।

ফাঁসি রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেন মেহেরপুর নারী ও শিশু দমন এবং শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিটর মোস্তাফিজুর রহমান তুহিন।

মামলার বিবরণীতে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৬ই জুন গাংনী উপজেলা চাঁদপুর গ্রামের পঞ্চম শ্রেণীর পড়ুয়া মেয়ে তার পিতাকে বাড়ির পাশের আবাদী মাঠে খাবার দিতে যাওয়ার সময় ধর্ষক শাকিল হোসেন শিশুটিকে দেশীয় অস্ত্র ধারালো হাসুয়া দিয়ে হত্যার ভয় দেখিয়ে পাশ্ববর্তী পাট খেতে নিয়ে গিয়ে শিশুটির ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। ধর্ষণ শেষে শিশুর চিৎকারে ধর্ষক পালিয়ে যায়। পরে মেয়েটির বাড়ি ফিরে তার পরিবারকে ধর্ষণের বিষয়টি জানালে গ্রামবাসী ধর্ষককে আটক করে গণপিটুনি দেয়। পুলিশ ধর্ষককে উত্তেজিত মানুষের কাছ থেকে উদ্ধার করে আটক করে। পরে শিশুর পিতা গাংনী থানায় গিয়ে একটি ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়ের পর পুলিশ ধর্ষককে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে প্রেরণ করে।

মামলার তদন্ত রিপোট পুলিশ দাখিলের পর আদালত ২৯ কার্য দিবসের মধ্যে ধর্ষণ মামলায় ১২ জন সাক্ষীর ভার্চুয়ালি ভিডিও কলে ও সশরীরে জবানবন্দি জেরা গ্রহণ করেন। সাক্ষ্য প্রমাণে এবং মেডিকেল পরীক্ষা রিপোর্টে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আদালত ধর্ষক শাকিল হোসেনকে মৃত্যুদণ্ড ৩ লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও ১ বছর কারাদণ্ড আদেশ দেন। জরিমানার টাকা ধর্ষকের স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে বিক্রয়লদ্ধ অর্থ আদালতের মাধ্যমে ভিকটিমের পরিবারকে পরিশোধের আদেশ দিয়েছে আদালত।

রায় ঘোষণাকালে আদালতে গণমাধ্যম কর্মীরা সহ আসামীপক্ষে আইনজীবী ও অন্য আইনজীবী, ধর্ষক উপস্থিত থেকে রায় শ্রবণ করেন। অ্যাডভোকেট মারুফ আহমেদ বিজন আসামী পক্ষে ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হিসাবে মোস্তাফিজুর রহমান তুহিন উপস্থিত ছিলেন। মৃত্যুদণ্ড রায়ে ধর্ষিত শিশুর পরিবার খুশি বলে সাংবাদিকদের জানান। অন্যদিকে দণ্ডপ্রাপ্ত শাকিল হোসেনের আইনজীবী উচ্চ আদালতে যাওয়ার কথা বলেন।

এই ঐতিহাসিক রায় সম্পর্কে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও নারী এবং শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মেহেরপুর বিচারালয়ের ইতিহাসে তো বটেই, গোটা দেশের প্রেক্ষাপটেও এত দ্রুততম সময়ে ধর্ষণ মামলার রায় ঘোষণা এটিই প্রথম এবং একটি অভাবনীয় ঘটনা। এই রায় বিচারপ্রার্থীদের মনে আইনের প্রতি আস্থা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে এবং শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতন প্রতিরোধে সমাজে একটি কঠোর বার্তা দেবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *