ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস-নেই কোনো তোড়জোড়, নিরবেই কাটছে ১৭ এপ্রিল

ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস-নেই কোনো তোড়জোড়, নিরবেই কাটছে ১৭ এপ্রিল

নিজ্স্ব প্রতিবেদক:

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অভ্যুদয়ের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত ১৭ এপ্রিল, ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। তবে এবার দিবসটি পালিত হচ্ছে নীরবতা ও অনানুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে। কেন্দ্রীয় কোনো কর্মসূচি বা বড় পরিসরের রাষ্ট্রীয় আয়োজন না থাকায় পুরো মুজিবনগর এলাকা জুড়েই দেখা যাচ্ছে এক ধরনের নিস্তব্ধতা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, দিবসটি উপলক্ষে এবার কোনো রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা না আসায় জেলা প্রশাসনও উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি। ফলে প্রতিবছরের মতো তোরণ, আলোকসজ্জা, কুচকাওয়াজ বা রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতিতে মুখর পরিবেশের পরিবর্তে এবার দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র।

মেহেরপুরের মুজিবনগরের ঐতিহাসিক আম্রকানন এলাকা, যেখানে প্রতি বছর হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে, সেখানে এবার নেই তেমন কোনো আয়োজন বা প্রস্তুতির ছাপ। স্মৃতিসৌধ চত্বরে নেই দৃশ্যমান কর্মতৎপরতা, নেই জাতীয় দিবসের আবহ।

জেলা প্রশাসনের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে, উপর মহল থেকে কোনো দিকনির্দেশনা না পাওয়ায় আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি গ্রহণ সম্ভব হয়নি।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে, ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠন করা হয় এবং ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে সেই সরকারের আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এদিন স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ একটি সাংবিধানিক ভিত্তি পায় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সংগ্রাম একটি সংগঠিত রাষ্ট্রীয় আন্দোলন হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

তৎকালীন সরকারে শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও এএইচএম কামরুজ্জামান গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।

এদিকে দিবসটির রাষ্ট্রীয় গুরুত্বের বিপরীতে মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সের বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কমপ্লেক্সে প্রায় ৬০০টি ভাস্কর্যের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় সংঘটিত হামলায় এসব ভাস্কর্যের বড় একটি অংশ ভেঙে ফেলা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, সংঘবদ্ধ একটি দল পরিকল্পিতভাবে কমপ্লেক্সে হামলা চালিয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে এবং সিসিটিভির হার্ডডিস্ক নিয়ে যায়। বর্তমানে গার্ড অব অনার ভাস্কর্যসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে। খোলা আকাশের নিচে থাকায় অবশিষ্ট অংশও ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে।

স্থানীয় গাইড ও মুক্তিযোদ্ধা সুভাষ মল্লিক বলেন, ‘দ্রুত সংস্কার কার্যক্রম শুরু না হলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। একজন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। আমি আশাবাদী প্রধানমন্ত্রী মুজিবনগরের মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

মুজিবনগরের মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স সংস্কারের বিষয়ে এর আগে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা (পিআরও) প্রতিবেদককে বলেছিলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সদ্য দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রয়েছে। খুব শিগগিরই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক মুক্তিযোদ্ধা বলেন, রাজনৈতিক বাস্তবতা যাই থাকুক না কেন, মুজিবনগর এবং মুজিবনগর দিবসের গুরুত্ব কোনো ভাবেই কমে যাওয়ার নয়। তাদের মতে, ১৭ এপ্রিলের শপথ গ্রহণই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রমাণ করেছিল, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে পরিচালিত স্বাধীনতার সংগ্রাম।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *