পিকিং স্টার’ হাঁসে স্বাবলম্বী মেহেরপুরের বাঁধন

পিকিং স্টার’ হাঁসে স্বাবলম্বী মেহেরপুরের বাঁধন

নিজস্ব প্রতিবেদক:

পরাজয় মানেই থমকে যাওয়া নয়-এই কথাটিকে অক্ষরে অক্ষরে সত্যি করে দেখিয়েছেন তরুণ উদ্যোক্তা বাঁধন। যে বয়সে সহপাঠীরা ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগে, সেই বয়সে তিনি গড়ে তুলেছেন সফলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। মাত্র ২০ হাজার টাকার পুঁজি নিয়ে শুরু করা একটি উদ্যোগ এখন তাঁকে এনে দিচ্ছে মাসে ৪ লাখ টাকার মুনাফা।

বাঁধন মেহেরপুর সদর উপজেলার রাধাকান্তপুর গ্রামের সেলিম ও দিলরুবা দম্পতির সন্তান। মেহেরপুর সরকারি কলেজের অনার্স পড়ুয়া ছাত্র। ছোটবেলা থেকেই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসতেন। সেই স্বপ্ন থেকেই প্রথম শুরু করেছিলেন শখের বাজরিকা পাখি পালন। কিন্তু প্রাণোচ্ছল সেই স্বপ্ন থমকে যায় কোভিড মহামারীর ধাক্কায়।

হাল না ছেড়ে এরপর ঝুঁকেছিলেন ব্রয়লার মুরগি পালনে। সেখানেও ভাগ্য সঙ্গ দেয়নি। বার্ড ফ্লুর প্রকোপে হারিয়ে ফেলেন সব বিনিয়োগ। পরপর দুটি বড় ধাক্কায় ভেঙে পড়া স্বাভাবিক হলেও বাঁধন পিছু হটেননি। নিজের ভেতরে থাকা উদ্যোক্তার সত্তাকে আবার জাগিয়ে তোলেন তিনি।

তিন বছর আগের কথা। হুট করেই সিদ্ধান্ত নেন নতুন কিছু করার। মায়ের দেওয়া ২০ হাজার টাকা সম্বল করে কিনে নেন ১০০টি ‘পিকিং স্টার-১৩’ জাতের হাঁসের বাচ্চা। এবার আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সঠিক পরিচর্যা, ধৈর্য আর কঠোর পরিশ্রমে ভর করে সেই ১০০ হাঁসের ছোট খামার আজ এক হাজার হাঁসের বিশাল খামারে রূপ নিয়েছে।

বাঁধনের চিন্তা শুধু খামারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তিনি ব্যবসাকে নিয়ে গেছেন পরবর্তী ধাপে। খামারের ঠিক পাশেই বসিয়েছেন ৩৬ হাজার বাচ্চা ফুটানোর ধারণক্ষমতাসম্পন্ন অত্যাধুনিক ইনকিউবেটর মেশিন। হাঁসের ডিম থেকে কৃত্রিম উপায়ে বাচ্চা ফুটিয়ে বাজারজাত করছেন সারা দেশে। বর্তমানে তাঁর ইনকিউবেটর থেকে সপ্তাহে প্রায় ২ হাজার হাঁসের বাচ্চা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলে যাচ্ছে।

সব ধরণের পরিচালন ও উৎপাদন খরচ বাদ দিয়েও বর্তমানে তাঁর মাসিক আয় প্রায় ৪ লাখ টাকা। একজন কলেজছাত্রের এই অভাবনীয় সাফল্য তাক লাগিয়ে দিয়েছে পুরো এলাকাকে।

বাঁধন বলেন, ছোট থেকেই আমার পশু-পাখির উপরে আলাদা একটা মায়া ছিলো। সেই থেকে আমি প্রথমত বাড়ির ছাদে বাজরিকা পাখি দিয়ে শুরু করেছিলাম। ব্যবসা কি বোঝার জন্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত করোনা মহামারী মধ্যে ব্যবসাটা দাঁড় করাতে পারিনি। পরে মুরগি নিয়ে কাজ শুরু করি। মুরগির ব্যবসাটা ভালোই চলছিলো। হঠাৎ মুরগি বার্ড ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে অনেক টাকা লোকসান হয়ে যায়। পরে ইউটিউবে দেখি কিছু কিছু উদ্যোক্তার হাঁস পালন করে সফলতা পাচ্ছে। সেটি থেকেই হাঁস পালনের চিন্তা মাথায় আসে। পরে অনেক যাচাইবাছাই করে অনলাইন থেকে পিকিং স্টার-১৩ জাতের ১’শ হাঁস কিনে আমার খামারের যাত্রা শুরু হয়। এখন আমার খামারে প্রায় ১ হাজার হাঁস রয়েছে। অধিকাংশ হাঁস ডিম দিতে শুরু করেছে। এখন নিজেরাই ইউকিবেটর মেশিনের মাধ্যমে বাচ্চা ফুটিয়ে বাজারজাত করছি। সপ্তাহে প্রায় দুই হাজার বাচ্চা উৎপাদন হচ্ছে। যার বাজার মূল্য প্রায় আড়াই লক্ষ টাকা। সকল খরচ বাদ দিয়ে মাসে ৪ লক্ষ টাকা প্রফিট হচ্ছে। ইতোমধ্যেই আরও ৫ হাজার হাঁসের খামার তৈরীর প্রস্তুতি চলছে।

বাঁধনের মা দিলরুবা খাতুন বলেন, ছোট থেকেই পশু-পাখি প্রতি আগ্রহ ছিলো ছেলের। ছোটবেলা থেকেই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখে সে। প্রথমে বাজরিকা পাখি পালন শুরু করলেও করোনার ধাক্কায় সফল হতে পারেনি। পরে আবারও মুরগি পালন শুরু করলেও সেখানেও সফল হতে পারেনি। পরপর দুটি ব্যর্থতার পরও সে থেমে যায়নি। হাঁস পালনে ছেলের হাতে মাত্র ২০ হাজার টাকা তুলে দিয়েছিলাম। সেই ২০ হাজার থেকে বর্তমানে ৩০ লক্ষ টাকায় ঠেকেছে।
তিনি আরও বলেন, চাকরির পিছনে না ছুটে বাব-মায়েরা যেন তাদের সন্তানদের উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী হিসেবে গড়ে তোলেন।

মেহেরপুর জেলা প্রণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, মেহেরপুর প্রাণিসম্পদে একটি সমৃদ্ধ জেলা। এই জেলায় বিভিন্ন ধরণের পশু-পাখি লালনপালন করা হয়। আমরা প্রাণিসম্পদের পক্ষ থেকে খামারীদের পশু-পাখি লালনপালন, ভ্যাকসিন সরবরাহ, খাদ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে পরামর্শ দিয়ে থাকি। এখানে হাঁস পালনে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যত রয়েছে। এখানকার খামারীরা অনেক কর্মঠ। তাদের সব ধরণের সহযোগিতা ও সমস্যা সমাধানে জেলা প্রাণিসম্পদ সবসময় তাদের পাশে রয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *